মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় গত দেড় বছরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এ তথ্য জানিয়েছে। কক্সবাজারের মাত্র ২৪ বর্গকিলোমিটার জায়গায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার।
মানবিক সহায়তার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল এই বিপুল জনগোষ্ঠীর কারণে শরণার্থী শিবিরগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র চাপ ও চরম সংকট। ইউএনএইচসিআর সতর্ক করেছে, চলতি সহায়তা অব্যাহত না থাকলে সেপ্টেম্বর থেকে স্বাস্থ্যসেবা ও এলপিজি জ্বালানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ডিসেম্বরের মধ্যে বন্ধ হতে পারে খাদ্য সহায়তাও।
‘আরও নিতে পারছি না’
কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পের পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এর মধ্যে প্রায় ৬৩ হাজার শিশু বর্তমানে শিক্ষা ঝুঁকিতে রয়েছে।
ক্যাম্প ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত এনজিও কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আলম বলেন,“এই পরিমাণ মানুষকে এক জায়গায় দীর্ঘ সময় ধরে টিকিয়ে রাখা শুধু কঠিনই নয়, প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগেও ছিল সংকট, এখন সেটা আরও তীব্র হয়েছে।”
নিবন্ধন আছে, সেবা পাচ্ছে; বাকিরা বঞ্চিত
ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, নতুন আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার জনের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু বাকিরা এখনো নিবন্ধনের বাইরে থাকায় তারা পাচ্ছেন না নিয়মিত খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা সুবিধা।
জার্মানভিত্তিক দাতা সংস্থা ‘ডব্লিউএফপি’-এর এক কর্মকর্তা বলেন,“নিবন্ধনের বাইরে থাকা মানুষদের জন্য সহায়তা পৌঁছানো একেবারে কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বেচ্ছাসেবকরা প্রতিদিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন।”
তহবিল সংকটে সব কিছু অনিশ্চিত
ইউএনএইচসিআর-এর সাম্প্রতিক সতর্কতায় বলা হয়েছে,“অতিরিক্ত দেড় লাখ রোহিঙ্গা আগমনের কারণে মানবিক সহায়তা ব্যবস্থায় ভাঙন ধরেছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা না বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।”
বিশেষ করে তারা আশঙ্কা করছে:
সেপ্টেম্বরের মধ্যে: স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা।ডিসেম্বরে: খাদ্য সহায়তা বন্ধ হতে পারে।
২ লাখ ৩০ হাজার শিশু শিক্ষা হারাতে পারে, যাদের মধ্যে ৬৩ হাজার শিশু নতুন আগত।
আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতি আহ্বান
বাংলাদেশ সরকার ও মানবিক সংস্থাগুলো মিলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও সহায়তায় দায়িত্ব পালন করে আসলেও অর্থ সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বলেন,
“মিয়ানমারে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী সহায়তা দেওয়া।”
দায় নিতে হবে আন্তর্জাতিক মহলকে
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের উপর চাপ বাড়ছে, কিন্তু এই সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। ফলে এর সমাধান হতে হবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আমেনা হক বলেন,“বাংলাদেশ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। আন্তর্জাতিক মহলের চাপ বাড়াতে হবে মিয়ানমারের ওপর।”
সংক্ষিপ্ত চিত্র
| বিষয় | সংখ্যা |
| নতুন রোহিঙ্গা (১৮ মাসে) | ১,৫০,০০০ |
| মোট রোহিঙ্গা (২০২৫ পর্যন্ত) | ১০,৫০,০০০+ |
| নিবন্ধিত নতুন | ১,২১,০০০ |
| নতুন শিশু | ৬৩,০০০ |
| শিক্ষা হারানোর ঝুঁকিতে | ২,৩০,০০০ শিশু |
শেষ কথা:
বাংলাদেশ উদারভাবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটি আর শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়—এটি এখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংকট। সময় এসেছে আন্তর্জাতিক সমাজের কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের।

