চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) অস্ত্র শাখায় ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। দায়িত্বে অনুপস্থিত থেকেও মাসে মাসে তোলা হচ্ছে পুরো বেতন ও ভ্রমণ ভাতা (টিএ/ডিএ)। কেউ কেউ মাসে মাত্র চার-পাঁচ দিন ডিউটি করেই তুলে নিচ্ছেন পুরো মাসের সরকারি অর্থ। পাশাপাশি ট্রেনের ভুয়া স্কর্ট ডিউটি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং রেলের জমি ও ভাসমান দোকান থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনিয়মের আড়ালে অস্ত্র শাখায় চালু রয়েছে ‘ভগবান ডিউটি’ নামের একটি অলিখিত নিয়ম। এই ব্যবস্থার অধীনে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে বেতন-ভাতা সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে মাসোহারা হিসেবে দিতে হয় নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষ। অভিযোগের তীর বাহিনীর চিফ ইন্সপেক্টর (সিআই) ও সহকারী কমান্ড্যান্ট (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ সালামত উল্লাহ এবং ‘সুন্দরী জসিম’ নামে পরিচিত সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের দিকে।
আরএনবি সূত্র জানায়, অস্ত্র শাখার ৮০ জন সদস্যের মধ্যে ২০ জনেরও বেশি সদস্য নিয়মিত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন হাবিলদার মো. ইউসুফ পাটোয়ারী, সিপাহী মো. আরিফুল ইসলাম, জিয়া উদ্দিন, মো. সোহেল রানা, কেশুয়া চন্দ্র কপালী, মো. নাজিম উদ্দীন চৌধুরী, মিঠুন চক্রবর্তী, আজিমুল হক সুমন ও মো. মিজানুর রহমান।
অভিযোগ রয়েছে, হাবিলদার মো. মনির হোসেন, হাবিলদার মো. জয়নাল আবেদিন, সিপাহী কেশুয়া চন্দ্র কপালী ও সিপাহী মোহাম্মদ মাহমুদুল ইসলাম মাসে মাত্র চার থেকে পাঁচ দিন দায়িত্ব পালন করেই পুরো মাসের বেতন নিচ্ছেন। এই সুবিধার বিনিময়ে সিআই সালামত উল্লাহকে জনপ্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে দিতে হয়।
অনুপস্থিত সদস্যদের নামে ভুয়া ভ্রমণ ভাতা (টিএ) তোলার চিত্রও উঠে এসেছে। হাবিলদার মো. ইউসুফ পাটোয়ারীর নামে গত মার্চ মাসে ২৬ দিনের ভ্রমণ ভাতা বাবদ ১৩ হাজার ৭৭৭ টাকা উত্তোলন করা হয়। ‘ফাইভ আপ’ ট্রেনে ডিউটি না করেও ভ্রমণ ভাতা তুলেছেন সিপাহী আজিমুল হক সুমন ও মো. মিজানুর রহমান। এ ছাড়া সিপাহী ওমর ফারুক, মো. মতিয়ার, মো. শাহাদাত হোসাইন খোকন ও মো. এনামুল হোসেন সরকারি দায়িত্ব পালন না করে সিআই সালামতের বাসায় ব্যক্তিগত কাজ করলেও নিয়মিত তাঁদের নামেও ভ্রমণ বিল তোলা হচ্ছে।
কেবল বেতন ও ভ্রমণ ভাতাতেই সীমাবদ্ধ নয় এই অনিয়ম। চট্টগ্রাম নগরীর টাইগারপাস ঘুরাইন্না গেটে রেলওয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনের ৬০-৭০টি দোকান থেকে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। এ ছাড়া পোস্তারপাড়ের বস্তি ও ছাগলের বাজার থেকে মাসে ১৩ হাজার, কদমতলীতে ফোর স্টার সিএনজি পাম্পের বিপরীতে কোয়ার্টারের ক্যারেট রাখার স্থান থেকে ৪ হাজার, ফলমন্ডির কোয়ার্টার থেকে ৫ হাজার, হাটহাজারীর জান আলী হাটে ২৫ হাজার এবং সিআরবি এলাকা থেকে দৈনিক ২০০ টাকা ও মাসে ৩ হাজার টাকা তোলা হয়। আকবর শাহের পাঞ্জাবি লেন ও শহীদ লেনে উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে ঘরপ্রতি আদায় করা হয় ৪ হাজার টাকা।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, টাইগারপাস এলাকায় ‘শাহীন’ নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে টাকা সংগৃহীত হয়, যা পরে পৌছে যায় এসআই জসিম উদ্দিনের কাছে। সংগৃহীত এই অর্থের একটি বড় অংশ পান সিআই সালামত উল্লাহ।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চিফ ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ সালামত উল্লাহ। তিনি বলেন, “আমাদের অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা হিংসার বশবর্তী হয়ে সাংবাদিকদের কাছে এসব ভুয়া তথ্য দিচ্ছেন। এখানে জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই; আমি স্বচ্ছতা বজায় রেখে কাজ করছি।” এসআই জসিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা জসিমের দায়িত্ব হলেও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম সম্পর্কে সালামত উল্লাহর কিছু জানা নেই।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এসআই মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।

