চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে আবারও উজ্জ্বল উপস্থিতি দেখিয়েছে শহরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। যেখানে বোর্ডজুড়ে পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, সেখানে শতভাগ পাস আর উচ্চমাত্রায় জিপিএ–৫ অর্জন করে নজর কেড়েছে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল, ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং সরকারি মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়।
শীর্ষে কলেজিয়েট স্কুল
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৪০৫ জন শিক্ষার্থী। পাস করেছে সবাই। এর মধ্যে ৩৪৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ–৫ পেয়েছে। শতকরা হিসেবে জিপিএ–৫ এর হার ৮৬.১৭ শতাংশ।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন,
‘ছাত্রদের নিয়মিত অধ্যয়ন, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা, শিক্ষকদের নিবেদন ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ—এই চারটি কারণেই আমরা এই সাফল্য পেয়েছি। আমাদের লক্ষ্য শুধু ফল নয়, ভালো মানুষ তৈরি।’
মেয়েদের মধ্যে এগিয়ে খাস্তগীর
চট্টগ্রামের কন্যাশিক্ষার অগ্রদূত ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৪৮৭ জন শিক্ষার্থী। পাস করেছে ৪৭১ জন। এর মধ্যে ৩৩৯ জন পেয়েছে জিপিএ–৫। শতাংশ হিসেবে যা ৬৯.৬১।
প্রধান শিক্ষিকা বলেন,
‘মেয়েরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও প্রযুক্তিনির্ভর। তারা জানে কীভাবে সময়কে কাজে লাগাতে হয়। ফলাফল তারই প্রতিফলন।’
ধারাবাহিক সাফল্যে মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়
সরকারি মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৪৮৫ জন। এর মধ্যে পাস করেছে ৪৮১ জন, জিপিএ–৫ পেয়েছে ৩২২ জন। শতকরা হিসেবে ৬৬.৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জিপিএ–৫ পেয়েছে।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ফল:
বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা বিদ্যালয়
মোট পরীক্ষার্থী: ৫৬১
জিপিএ–৫: ৩১০ (৫৫.২৫%)
নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
মোট পরীক্ষার্থী: ৫১৮
জিপিএ–৫: ২৭৩ (৫২.৭%)
চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
মোট পরীক্ষার্থী: ৩৩০
জিপিএ–৫: ২০৮ (৬৪.৮%)
বোর্ডে পাসের হার কমলেও জিপিএ–৫ বেড়েছে:
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৭২.০৭ শতাংশ। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ কম। তবে আশার কথা, জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। গত বছর যেখানে ১০ হাজার ৮২৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ–৫ পেয়েছিল, এবার পেয়েছে ১১ হাজার ৮৪৩ জন।
চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) দুপুরে এ ফলাফল ঘোষণা করেন। তিনি জানান, এবার বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ৩৩ জন। এর মধ্যে পাস করেছে ১ লাখ ১ হাজার ১৮১ জন।
শহর ও গ্রামীণ এলাকার মধ্যে পাসের হারে বৈষম্য ছিল স্পষ্ট। চট্টগ্রাম নগরে পাসের হার ছিল ৮১.০৩ শতাংশ, নগরের বাইরে তা ৭১.২৯ শতাংশ।
পার্বত্য জেলায় পাসের হার উদ্বেগজনক:
তিন পার্বত্য জেলায় ফলাফল আশঙ্কাজনক। রাঙামাটিতে পাসের হার ৫৬.৫৫ শতাংশ, খাগড়াছড়িতে ৬০.৭৭ শতাংশ এবং বান্দরবানে ৬৩.১২ শতাংশ। কক্সবাজারেও পাসের হার ৭০.৭৬ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক চিত্র:
বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার: ৯২.৫৭%
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে: ৭৩.৫৪%
মানবিক বিভাগে: ৫৫.০২%
জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ হাজার ৪৫৮ জন ছিল বিজ্ঞান বিভাগে, ১ হাজার ২৪৭ জন ব্যবসায় শিক্ষায় এবং মানবিক বিভাগে মাত্র ১৩৮ জন।
বিশ্লেষণে যা উঠে এসেছে:
শিক্ষাবিদেরা বলছেন, শহরের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত ক্লাস, মানসম্মত শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সক্রিয় ভূমিকার কারণে ফলাফলে তাদের এই অগ্রগতি। তবে একই সঙ্গে তারা মনে করছেন, গ্রামের স্কুলগুলোতে শিক্ষা-পরিকাঠামো, শিক্ষক সংকট ও শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রবণতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

