বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনে সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে দেশকে ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেলে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, পূর্ববর্তী ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেল টেকসই ছিল না; বিশেষ করে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সঞ্চিত বিপুল ঋণের চাপ দেশের ওপর পড়েছে।
রাজধানীতে আজ অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন পর্যালোচনা: নবনির্বাচিত সরকারের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিতুমীর জানান, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার দ্রুত বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক মডেলে রূপান্তরের কাজ করছে। এই মডেল দেশীয় বিনিয়োগ ও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই)–উভয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, এই রূপান্তরের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বে সর্বনিম্ন স্তরের মধ্যে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, ধাপে ধাপে অগ্রগতির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথমে ২ শতাংশ এবং পরে ১০ শতাংশ পর্যন্ত মধ্যবর্তী লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের পথে এগোনো হবে।
বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানভিত্তিক কর সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, বিদ্যমান রাজস্ব কাঠামোয় একাধিক কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে, যা দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। স্ট্যাটুটরি রেগুলেটরি অর্ডার (এসআরও)–এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটি এমন এক বাজারে পরিণত হয়েছে যেখানে প্রভাব কেনাবেচা হয়। ন্যায্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে এ নির্ভরতা কমাতে হবে।
তিনি আরও জানান, পরিচয় ও প্রভাবভিত্তিক ‘গ্রিনফিল্ড’ প্রণোদনার পরিবর্তে সরকার কার্যসম্পাদনভিত্তিক (এক্স-পোস্ট) ভর্তুকি ব্যবস্থায় যেতে চায়। তৈরি পোশাক খাতে সফল এ মডেলে সম্ভাবনার ভিত্তিতে নয়, বাস্তব ফলাফলের ওপর প্রণোদনা দেওয়া হবে।
রাজস্ব আদায়ে শুধু বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)–এর ওপর নির্ভরশীলতার প্রবণতাকেও বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন তিতুমীর। তিনি বলেন, সব ইউনিটে সমানভাবে রাজস্ব আহরণ জোরদার করতে হবে।
বর্তমান দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি কার্যকর সমাধান নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অপচয় রোধ এবং রাজস্ব নীতির পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি এডিপি বাস্তবায়ন হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেন।
জ্বালানি খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির চাপ কমাতে সরকার তিনটি কৌশলগত পদ্ধতি গ্রহণ করছে বলেও জানান তিনি।
শেষে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিতুমীর বলেন, জনসাধারণের পণ্য ও সেবার অর্থায়নে যথাযথ কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে সামগ্রিক সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।

