30 C
Chittagong
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
spot_img

― Advertisement ―

spot_img
প্রচ্ছদচট্টগ্রামশ্রেষ্ঠ বিএনসিসি শিক্ষক সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম

শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও গবেষণায় এক অনন্য পথচলা

শ্রেষ্ঠ বিএনসিসি শিক্ষক সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম

মনিরুল হক মনির, বিশেষ প্রতিনিধি

শিক্ষকতা, গবেষণা ও ক্যাডেট প্রশিক্ষণ—এই তিনটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সহজ কাজ নয়। তবু নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেই কঠিন দায়িত্ব দীর্ঘদিন ধরে পালন করে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও বিএনসিসি কর্মকর্তা সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। এরই স্বীকৃতি হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ–২০২৬ উপলক্ষে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের শ্রেষ্ঠ বিএনসিসি শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) কর্ণফুলী রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানির কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ অর্জন শুধু একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি চট্টগ্রাম বিভাগের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিএনসিসি কার্যক্রমের জন্যও গৌরবের।

পার্বত্য জনপদ থেকে উচ্চশিক্ষার পথচলা:

বান্দরবান পার্বত্য জেলার সুয়ালক ইউনিয়নের কদুখোলা গ্রামের সন্তান মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের শিক্ষাজীবনের শুরু পাহাড়ি জনপদের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই। ১৯৯৫ সালে শেরেবাংলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য নিয়ে চট্টগ্রামে আসেন।১৯৯৮–৯৯ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন সিরাজুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তার মধ্যে শিক্ষকতা ও গবেষণার প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে তার পেশাজীবনের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।

চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজে শিক্ষকতা:

২০০৮ সালে তিনি চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজে অনার্স শাখার ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। পাঠদানে দক্ষতা, শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিকতা এবং একাডেমিক শৃঙ্খলার কারণে অল্প সময়েই তিনি শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের আস্থা অর্জন করেন। নির্ধারিত শর্ত পূরণ ও সন্তোষজনক কর্মমূল্যায়নের ভিত্তিতে ২০১৬ সালে তিনি সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ও একাডেমিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই কলেজ পরিচালনা পর্ষদের ৯১তম সভায় তাকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

বিএনসিসিতে শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব:

শিক্ষকতার পাশাপাশি বিএনসিসিতে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে আসছেন মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। ২০১৭ সালে তিনি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে প্রি-কমিশন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। একই বছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে কর আইনজীবী হিসেবে সনদ অর্জন করেন। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট থেকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা লাভ করেন তিনি। ২০২৫ সালে তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি পান এবং বর্তমানে কর্ণফুলী রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানির কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে ক্যাডেটদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিএনসিসিতে তার অবদান একাধিকবার স্বীকৃত হয়েছে। ২০১৬, ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২৩ সালে তিনি থানা পর্যায়ে চারবার, জেলা পর্যায়ে দুইবার এবং বিভাগীয় পর্যায়ে দুইবার শ্রেষ্ঠ বিএনসিসি শিক্ষক নির্বাচিত হন। বিএনসিসি অধিদপ্তরের নির্দেশিত ২১টি প্রশিক্ষণ তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।

গবেষণা ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন:

শিক্ষা ও ক্যাডেট প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গবেষণায়ও সক্রিয় মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা সাময়িকী ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব রিসার্চ ফর কমার্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট–এ তার গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। বর্তমানে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি পর্যায়ে তার গবেষণার বিষয়—
‘বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের ভূমিকা: পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক একটি ক্ষেত্রসমীক্ষা।’ এই গবেষণার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অনুষদের অধীন ব্যবসা গবেষণা ব্যুরো আয়োজিত ‘ভবিষ্যৎ ব্যবসা: উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি তার গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন।

লেখালেখি ও একাডেমিক দায়িত্ব:

মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম অনার্স পর্যায়ে পাঁচটি পাঠ্যবই এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুমোদিত হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের দুটি বইয়ের লেখক। পাশাপাশি চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের বার্ষিক প্রকাশনা গিরিপ্রভা-য় ‘পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটন: জাতীয় অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় রাজস্ব খাত’ শীর্ষক প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রধান পরীক্ষক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

সমাজে দায়বদ্ধতা:

শিক্ষা ও পেশাগত জীবনের বাইরে তিনি ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত। মাদ্রাসা ও এতিমখানা পরিচালনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর আইনজীবী সমিতি, বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই সংগঠন, পরিবেশ বিষয়ক সংগঠন এবং স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে তার আজীবন সদস্য ও দাতা হিসেবে সম্পৃক্ততা রয়েছে।

নীরব সাধনায় অর্জিত স্বীকৃতি:

সহকর্মীরা জানান, প্রচারের চেয়ে দায়িত্ব পালনে বিশ্বাসী এই শিক্ষক নীরবে কাজ করে যেতে পছন্দ করেন। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে প্রাপ্ত এই সম্মান তার দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলেও ভবিষ্যতে দায়িত্ব ও প্রত্যাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও গবেষণার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই পথচলা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।