বিদেশে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে মাস তিনেক আগে দেশে ফিরেছিলেন ইউনুছ মিয়া (৪৫)। আশা ছিল পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে আবার ফিরে যাবেন দুবাইয়ের কর্মস্থলে। কিন্তু আপন ভাগনের লালসা আর নিষ্ঠুরতায় সেই স্বপ্ন এখন হাসপাতালের বিছানায় বন্দি। চাঁদার টাকা না পেয়ে দুবাইপ্রবাসী মামাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে রক্তাক্ত করার ঘটনায় এবার ভাগিনাসহ চারজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।
গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের দ্বিতীয় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাখাওয়াত হোসেনের আদালত এই আদেশ দেন। মামলার প্রধান আসামি প্রবাসীর আপন ভাগিনা মো. সালাউদ্দিন।
ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের খলিফাপাড়া এলাকায়। মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইউনুছ মিয়া দেশে ফেরার পর থেকেই সালাউদ্দিন দাবি করে আসছিলেন ২ লাখ টাকা। তাঁর যুক্তি ছিল— মামা বিদেশ থেকে অনেক টাকা নিয়ে এসেছেন, তাই তাঁকে এই টাকা দিতেই হবে। কিন্তু ইউনুছ মিয়া এই অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং বিষয়টি পরিবারের মুরুব্বিদের জানান। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন সালাউদ্দিন।
গত ১৪ মার্চ বিকেলে ইউনুছ মিয়া সরকারহাট বাজারে যাওয়ার পথে ওত পেতে থাকা একদল যুবক তাঁর ওপর হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, সালাউদ্দিন ও তাঁর সহযোগীরা লোহার রড ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে ইউনুছকে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তাঁর পকেটে থাকা ৫০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
গত ২৩ মার্চ ইউনুছ মিয়ার দুবাই ফেরার কথা ছিল। কিন্তু শরীরের জখম আর মানসিক ট্রমা তাঁকে আর উড়োজাহাজে চড়তে দেয়নি। ভুক্তভোগীর জামাতা মো. ফয়েজ বলেন, ‘অসুস্থতার কারণে তাঁর বিদেশ যাওয়া বাতিল হয়েছে। সময়মতো কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারায় তাঁর চাকরিটা থাকবে কি না, তা নিয়ে আমরা চরম দুশ্চিন্তায় আছি। আপন মানুষের এমন বিশ্বাসঘাতকতা আমরা ভাবতেও পারিনি।’
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে ইউনুছ মিয়ার স্ত্রী মোছাম্মৎ হুসনে আরা বেগম আদালতে মামলা করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. মফিজুল আলম বলেন, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত ফৌজদারি অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। ঘটনার ভয়াবহতা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে আদালত সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন।’
সমাজ বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রবাসীদের উপার্জনকে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে ‘ব্যক্তিগত অধিকার’ মনে করার প্রবণতা থেকে এমন অপরাধ বাড়ছে। হাটহাজারীর এই ঘটনাটি তারই এক কদর্য উদাহরণ। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা না হলে প্রবাসীদের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

