চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী ওয়্যারলেস এলাকার ‘নাহার অপটিক্যাল হাউজ’। সন্ধার পর থেকেই বাড়ে ভিড়। চোখে ব্যথা, ঝাপসা দেখা, অ্যালার্জি—বিভিন্ন সমস্যায় রোগীরা অপেক্ষা করছেন মো. মোস্তফা ফারুকী ভূঁইয়ার জন্য। তিনি রোগী দেখেন, সমস্যার কথা শোনেন, প্রেসক্রিপশনও লিখে দেন। কিন্তু তিনি চক্ষু চিকিৎসক নন—এ দাবি করেছেন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সনদ চাওয়া হলে তিনি কোনো নিবন্ধিত ডিগ্রি দেখাতে পারেন না। তবু প্রতিদিনই ২০–৩০ রোগী তাঁর কাছে আসেন।
“কে ডাক্তার, কে নয়—আমরা বুঝি না”:
ওই এলাকার বাসিন্দা সালেহা খানম (৬০)। চোখে ব্যাথা নিয়ে গিয়েছিলেন ফারুকীর কাছে। প্রেসক্রিপশনে তাঁকে দেওয়া হয়েছে রেক্টোবিট, পলিটার আই ড্রপ ও ভিসোবিস ক্যাপসুল। তিনি বলেন, “এলাকার লোকজন এখানে আসে। চেম্বার আছে, প্রেসক্রিপশন দেন—তাই ধরে নিই, তিনি ডাক্তার। ”চক্ষু চিকিৎসকেরা বলছেন—এসব ওষুধ লেখার অধিকার নিবন্ধিত বিশেষজ্ঞ ছাড়া কারও নেই। ভুল চিকিৎসায় রোগীর চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রতিদিন রোগী দেখেন, তবে ডিগ্রি অস্পষ্ট:
কয়েক দিন সরেজমিনে দেখা গেছে—রোগীদের প্রশ্ন করেন,চোখের প্রাথমিক পরীক্ষা করেন, তারপর প্রেসক্রিপশন লিখে দেন। প্রেসক্রিপশনে নামের সাথে জুড়ে দিয়েছে—“O.P.T.C EYE (BNSB), পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম” নামের একটি পরিচয়। চক্ষুবিভাগের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন—এ নামে কোনো স্বীকৃত চক্ষু–সম্পর্কিত ডিগ্রি নেই। কেন খুলশীতে বসে প্রেসক্রিপশনে ‘পাহাড়তলী’ দেখাচ্ছেন—মো. মোস্তফা ফারুকী ভূঁইয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আগে এলাকা পাহাড়তলী ছিল।” পরে প্রশ্ন এড়াতে গিয়ে বলেন, তিনি একটি ডিপ্লোমা কোর্স করেছেন। প্রেসক্রিপশন কেন লিখছেন—এ প্রশ্নে তিনি দাবি করেন সরকার থেকে দেওয়া একটি নির্দেশনার ভিত্তিতে রোগী দেখেন। তবে ডাক্তার নন—এ বিষয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত পরোক্ষভাবে অপরাধ স্বীকার করেন।
অপারেশন কক্ষে গাউন পরে—ভিডিও নিয়ে প্রশ্ন:
কিছুদিন আগের একটি ভিডিওতে দেখা যায়—অপারেশন থিয়েটারের পোশাক পরে তিনি চিকিৎসক ডা. রায়হানের পাশেই দাঁড়িয়ে রোগীর দিকে মনোযোগ । এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,“একটি ফোঁড়া ফুটিয়ে দিয়েছি।” চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য—নিবন্ধিত চিকিৎসক ছাড়া এ ধরনের কাজ করা আইনবিরুদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ।
হাসপাতালের দাবি—রোগী দেখার অভিযোগে চাকরিচ্যুত:
পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের মেডিক্যাল ডিরেক্টর এবং চক্ষু চিকিৎসক সমিতির চট্টগ্রাম বিভাগের সাধারণ সম্পাদক ডা. রাজিব হোসেন বলেন, “তিনি আমাদের হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। রোগী দেখছেন—এ তথ্য জানার পরই তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিএমডিসির নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধন ছাড়া কেউ রোগীর চিকিৎসা দিতে পারে না। এমনকি চক্ষুবিশেষজ্ঞ না হলে এমন প্রেসক্রিপশন লেখার প্রশ্নই আসে না।” হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সিভিল সার্জনকে জানিয়েছে বলেও তিনি জানান।
স্বাস্থ্য পরিচালকের বক্তব্য:
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ ফজলে রাব্বি বলেন,“নিবন্ধিত চিকিৎসক না হলে প্রেসক্রিপশন দেওয়া যায় না। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আইন কী বলে?:
বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)–এর নীতি অনুযায়ী—চিকিৎসার জন্য প্রেসক্রিপশন লিখতে হলে চিকিৎসকের নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক, চক্ষুবিদ্যা (অপথ্যালমোলজি)–সংক্রান্ত চিকিৎসা দিতে হলে বিশেষজ্ঞ নিবন্ধন প্রয়োজন ও চিকিৎসক পরিচয় ব্যবহার করা বা চিকিৎসা দেওয়ার ভান করাও দণ্ডনীয় অপরাধ
ঝুঁকিতে সাধারণ রোগী:
বিশেষজ্ঞদের মতে—চোখের রোগে ভুল চিকিৎসা বা ভুল ওষুধ ব্যবহার করলে—কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে নষ্ট হতে পারে ও পরিস্থিতি জটিল হয়ে অস্ত্রোপচার পর্যন্ত যেতে পারে। স্থানীয়দের মতে, চেম্বার, চশমার দোকান ও প্রেসক্রিপশনের সমন্বয়ে এটি ‘চিকিৎসাসেবা’ হিসেবে দেখালেও আসলে রোগীরা বুঝে উঠতে পারেন না দায়িত্বশীল কে।
সচেতন মহলের মন্তব্য :
চেম্বার আছে, প্রেসক্রিপশন আছে, কিন্তু নেই কোনো বৈধ সনদ—এ রকম পরিস্থিতিতে রোগীরা দ্বিধায় পড়েন। খুলশীর ঘটনাটি শুধু এক এলাকার নয়; স্বাস্থ্যসেবা তদারকির ঘাটতি কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—তা আবারও সামনে এনে দিল।

