দলটির ভেতরে যে ক্ষোভ বহুদিন ধরে তলার আগুনের মতো জমে ছিল, এখন তা আর আড়ালে নেই। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র—সব জায়গায় একই অভিযোগ: নেতৃত্বের অদক্ষতা, সংগঠনের অগোছালো ব্যবস্থাপনা এবং ‘সুশীল রাজনীতি’-র মোড়ক দিয়ে বাস্তব সংকটকে ঢেকে রাখার প্রবণতা দলকে ক্রমেই দুর্বল করে তুলেছে। একসময়ের আন্দোলনভিত্তিক শক্তি আজ দিশাহীন; যার নেপথ্যে রয়েছে ভুল পৃষ্ঠপোষকতা, আদর্শবর্জিত সিদ্ধান্ত এবং তোষামোদতন্ত্রের দীর্ঘ ছায়া।
ইমেজ-রাজনীতির উত্থান ও সংগঠনের পতন:
দলের কর্মীরা অভিযোগ করেন—যেদিন থেকে কয়েকজন নেতা রাজনৈতিক মাঠ ছেড়ে “মানবতার ফেরিওয়ালা” পরিচয়কে সামনে আনতে শুরু করেন, সেদিন থেকেই সংগঠন দুর্বল হতে থাকে। দলকে সুসংগঠিত করা, কর্মীদের ধরে রাখা বা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনা করার বদলে তারা বেশি মন দিয়েছেন সুশীল ইমেজ টিকিয়ে রাখতে। কর্মীদের ভাষায়, মানবতার টান যদি সত্যিই প্রধান হতো, তবে সামাজিক কর্মী হিসেবেই গ্রামে-গঞ্জে কাজ করলেও পারতেন; একটি রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রয়োজন ছিল না।
মুখোশের আড়ালে সুবিধাবাদ:
তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ—‘ক্লিন ইমেজ’ আসলে এক ধরনের মুখোশ। এর আড়ালে লুকিয়ে আছে সুবিধাবাদ, অবস্থান বদলের রাজনীতি, আদর্শশূন্যতা। মেধাবী বা যোগ্য কর্মীদের প্রতি তাদের অনীহা স্পষ্ট; বরং প্রাধান্য পেয়েছে তোষামোদ, গ্রুপিং-রাজনীতি আর দলানুগত বাটপারির সংস্কৃতি।
সংগঠন পরিচালনায় ব্যর্থতা: ক্ষয়ের মূল:
গত কয়েক বছরে সংগঠন পরিচালনার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বারবার। অনেকেই মনে করেন—এই সুশীল নেতারা ছিলেন না রাজনৈতিক কৌশলের খেলোয়াড়; বরং ছিলেন দ্বন্দ্ব উসকে দেওয়া, বিভাজন তৈরির ওস্তাদ। কর্মীদের অভিযোগ, নেতৃত্বের নামে অপমান, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, ক্ষমতার অতিরিক্ত প্রদর্শন ছিল তাদের নিত্য আচরণ। কারও মতে, কথাবার্তা, ভঙ্গিমা—সব মিলিয়ে অনেক সময় মনে হয়েছে যাত্রাপালার চরিত্রেরা যেন দলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সুশীলতার খোলসে শূন্য রাজনীতি:
অন্ধ তোষামোদ ও ইমেজ রক্ষার দৌড়ে দল হারিয়েছে তার রাজনৈতিক ধার, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও সংগঠনগত শক্তি। যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা ভরাট করেছে অনিয়ম, ব্যক্তিস্বার্থ আর অগোছালো সিদ্ধান্ত। কর্মীদের সারসংক্ষেপ তাই স্পষ্ট—“যোগ্যদের দূরে রাখা হয়েছে, তোষামোদীদের চারদিকে বসানো হয়েছে। ভুল নেতৃত্বই আজকের সংকটের কেন্দ্রবিন্দু।”
শেষ প্রশ্ন:
দলের ভবিষ্যৎ কোন দিকে—এ প্রশ্ন এখন নেতৃত্বের টেবিল ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে তৃণমূলের ঘরে ঘরে।
নেতৃত্ব কি সুশীলতার মুখোশ সরিয়ে বাস্তবতার সামনে দাঁড়াতে পারবে?
নাকি এই ভাঙনই হবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পথচলার অনিবার্য পূর্বাভাস?
এক কথায় বলতে গেলে তৃণমূলই দলের মূলশক্তি।
লেখক: আয়েশা সোনিয়া — আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

