17.5 C
Chittagong
শনিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫
spot_img

― Advertisement ―

spot_img
প্রচ্ছদরাজনীতিচট্টগ্রাম–১২ ও ১৩ বিএনপি দলীয় প্রার্থী নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ!

দুই প্রার্থীর মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি

চট্টগ্রাম–১২ ও ১৩ বিএনপি দলীয় প্রার্থী নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ!

সুসংবাদ ডেস্ক

চট্টগ্রাম–১২ (পটিয়া) ও চট্টগ্রাম–১৩ (আনোয়ারা–কর্ণফুলী) আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন নিয়ে তৃণমূলে শুরু হয়েছে ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড়। ঘোষিত দুই প্রার্থী—এনামুল হক এনাম ও সাবেক এমপি সরওয়ার জামাল নিজামকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন মাঠের রাজনীতি থেকে দূরে থাকা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের মনোনয়ন দিয়ে ত্যাগী নেতাদের বঞ্চিত করেছে কেন্দ্র।

গত ৩ নভেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে ঘোষিত প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকায় এই দুই নাম ওঠার পরপরই পটিয়া ও আনোয়ারা–কর্ণফুলীতে দলীয় কার্যালয় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। তৃণমূল নেতাদের ভাষ্য, “যারা আন্দোলনে ছিলেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, তাদের বাদ দিয়ে যারা বিতর্কের দায়ে বহিষ্কৃত হয়েছিল, তাদের পুরস্কৃত করা হয়েছে।”

পটিয়ায় ক্ষোভের কেন্দ্র এনামুল হক এনাম:

চট্টগ্রাম–১২ আসনে প্রার্থী হয়েছেন এনামুল হক এনাম। তৃণমূলের অভিযোগ, এনাম এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তার অনুসারীরা শিল্প এলাকায় চাঁদাবাজি, দখল ও বালু মহাল বাণিজ্যে জড়িত ছিল—যা দলকে বিব্রত করেছে।
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায়ে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন তিনি। সেই সময় কালুরঘাট শিল্প এলাকায় মীর গ্রুপের গুদাম থেকে ১৪টি বিলাসবহুল গাড়ি সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় এনামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে দুই মাসের মাথায় বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এমন অতীত থাকা সত্ত্বেও তাকে প্রার্থী করায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় নেতারা।

পটিয়া উপজেলা বিএনপির এক সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক বলেন, “এনামের মনোনয়ন পটিয়ার শিক্ষিত সমাজের জন্য অপমান। যে ব্যক্তি বহিষ্কৃত, তার হাতে আবার দলীয় পতাকা তুলে দেওয়া হচ্ছে।” ফেসবুকে মীর জাহান নামের একজন লিখেছেন, “এস আলমের গাড়িকাণ্ডে বহিষ্কৃত নেতা এনামকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। হাসছে মানুষ, কাঁদছে তৃণমূল।” আরেকজন, আবদু ওয়াহিদ মুরাদ মন্তব্য করেছেন, “বিতর্কিত নেতাদের টাকা আর প্রভাবই কি এখন যোগ্যতার মাপকাঠি?” এই পোস্টে চার হাজারের বেশি মানুষ মন্তব্য করেছেন, যার বেশিরভাগই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের সমালোচনামূলক।

তৃণমূল মনে করে, এই সিদ্ধান্তে স্থানীয়ভাবে বিভাজন বাড়বে এবং ভোটের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তাদের মতে, পটিয়ায় সাবেক এমপি গাজী মোহাম্মদ শাহজাহান জুয়েল, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ইদ্রিস মিয়া, ছাত্রদল নেতা সাইফুদ্দিন সালাম মিঠু, কেন্দ্রীয় সদস্য সৈয়দ সাদাত আহমেদ—এমন সক্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতাদের উপেক্ষা করে বিতর্কিত ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে এনামুল হক এনাম জানান, “যারা মনোনয়ন পাননি, তাদের অনুসারীরা হয়তো কষ্ট পেয়েছেন। আমি সবাইকে নিয়ে কাজ করব। আমার ভুল থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ দিন।”

আনোয়ারা–কর্ণফুলীতে ‘বহিরাগত’ মনোনয়ন বিতর্ক:

চট্টগ্রাম–১৩ (আনোয়ারা–কর্ণফুলী) আসনে প্রার্থী করা হয়েছে সাবেক এমপি সরওয়ার জামাল নিজামকে। স্থানীয় নেতাদের অভিযোগ, তিনি গত ১৭ বছর ধরে এলাকায় অনুপস্থিত। দলীয় কর্মসূচিতে মাঠের নেতা–কর্মীরা জেল–জুলুম সহ্য করলেও তিনি কোনোদিন পাশে দাঁড়াননি।
মনোনয়ন ঘোষণার পর আনোয়ারায় দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ হয়।

আনোয়ারা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব গাজী ফোরকান বলেন, “দল বলেছিল মাঠে থাকা তৃণমূল নেতাকে মনোনয়ন দেবে। কিন্তু যারা দুঃসময়ে ছিলেন না, তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।”
আনোয়ারা উপজেলা যুবদল নেতা অ্যাডভোকেট নুরুল কবির রানা বলেন, “সরওয়ার জামাল নিজাম মৌসুমি নেতা। তার প্রার্থী হওয়া তৃণমূলের প্রতি অপমান।”

অন্যদিকে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দীন, সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ও যুবদল সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান—এই তিনজনকে তৃণমূল দীর্ঘদিন ধরে ‘যোগ্য প্রার্থী’ হিসেবে দেখেছে।
তাদের মতে, এই তিনজন গত ১৭ বছর আন্দোলন, গ্রেপ্তার ও দমননীতির মুখে থেকেও দলকে টিকিয়ে রেখেছেন।

সরওয়ার জামাল নিজাম অবশ্য অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “দল আমাকে যোগ্য মনে করেই প্রার্থী করেছে। বিএনপির প্রার্থী মানে ধানের শীষের প্রার্থী—ব্যক্তিগত অপছন্দের জায়গা নয়, সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”

দলীয় বিভাজনের আশঙ্কা:

দক্ষিণ জেলা বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, “কেন্দ্র বলে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হবে, কিন্তু মাঠে তার উল্টো চিত্র। এতে আসন্ন নির্বাচনে দলের ক্ষতি হতে পারে।” তৃণমূল নেতারা মনে করছেন, বিতর্কিত প্রার্থীদের মনোনয়ন বহাল থাকলে অনেক কর্মী ভোটকেন্দ্রে যাবে না।
দলীয় বিশ্লেষকের ভাষায়, পটিয়া ও আনোয়ারার এই ক্ষোভ যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ অঞ্চলে বিএনপির নির্বাচনী সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।