18.6 C
Chittagong
সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
spot_img

― Advertisement ―

spot_img
প্রচ্ছদচট্টগ্রামহাজারীগলিতে স্বর্ণের দোকানে হামলা, কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

হাজারীগলিতে স্বর্ণের দোকানে হামলা, কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

স্বর্ণ ব্যবসা ও পারিবারিক সম্পর্ক জড়িয়ে তোলপাড়—একপক্ষের অভিযোগ চাঁদা দাবি ও হামলার, অন্যপক্ষের দাবি ৬ কোটি টাকার পাওনা

বিশেষ প্রতিবদেক, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম নগরীর হাজারীগলি এলাকায় একটি স্বর্ণের দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী পক্ষ বলছে, বিষয়টি আসলে কোটি টাকার দেনা–পাওনা ও পারিবারিক বিরোধ থেকে সৃষ্টি হয়েছে।

ওমেক্স ধরের অভিযোগ: স্বর্ণ ব্যবসায়ী ওমেক্স ধর দাবি করেছেন, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী যীশু বণিক ও তাঁর সহযোগীরা তাঁর দোকানে একাধিকবার হামলা চালিয়ে ৬ কোটি টাকা দাবি করেছেন।
ওমেক্সের ভাষায়, গত ১৬ জানুয়ারি রাতে যীশু বণিকের শ্যালক অনুপম বণিক ও পিকলু বণিকের নেতৃত্বে প্রায় ১০–১২ জন তাঁর দোকানে হামলা চালায়। “দোকানের আসবাব ও মালামাল ভাঙচুর করে, কর্মচারী সবুজ দত্তকে মারধর করে। তারপর বলে— টাকা না দিলে দোকান বন্ধ করে দেবে,” বলেন তিনি। ওমেক্স জানান, ঘটনার পর তিনি আদালতে মামলা করেন— সিআর মামলা নং ১৯৫/২৪ (কোতোয়ালি) দণ্ডবিধির ৩৮৫, ৩৮৭, ৪৪৮, ৫০৬, ১৪৩ ও ৩৪ ধারায়।
কিন্তু মামলা করার পরও হামলার ভয় রয়ে গেছে বলে জানান তিনি। “প্রায় প্রতিদিন ফোনে ভয় দেখানো হয়— বলা হয় প্রতি মাসে ১০ ভরি স্বর্ণ দিতে হবে। না দিলে বিপদ হবে,” বলেন ওমেক্স ধর।

তিনি আরও দাবি করেন, “যীশু বণিক সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব খাটাচ্ছেন, তাই পুলিশ মামলা নিতে টালবাহানা করছে।” ওমেক্সের অভিযোগ, ১৭ ও ১৯ অক্টোবর তাঁর দোকানে ফের হামলার ঘটনা ঘটে। দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ ও মালামাল নষ্ট করা হয়।

যীশু বণিকের পাল্টা বক্তব্য: অভিযোগের বিষয়ে হাজারী লেইন জুয়েলারি সমিতির সভাপতি যীশু বণিক বলেন, “আমার শালা থেকে ৬ কোটি টাকা নিয়েছে স্বর্ণ দেওয়ার কথা বলে। এছাড়া টাকা দেওয়া অন্য চারজনের মধ্যে দুইজন আত্মহত্যা করেছে, দুইজন স্ট্রোক করেছে। এখন আমাকে দোষ দেওয়া হচ্ছে।” তিনি বলেন, “আমার শালাবাবু আমার শ্বশুরকে না জানিয়ে ওই টাকা দিয়েছে। শ্বশুর একমাত্র ছেলেকে ভালোবাসেন, তাই কিছু বলতে পারছেন না।”

যীশু বণিক আরও বলেন, “রাজু ধর আমার মামা ও ওস্তাদ। আমি ১৯৯৫ সালে তাঁকে ২০ ভরি স্বর্ণ ও ৫ লাখ টাকা দিয়ে দোকান নিয়ে দিয়েছি। পরে সম্প্রতি উল্টো আমার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে।” ত্যাজ্য ঘোষণার বিষয়ে তিনি বলেন, “এটা নাটক। রনেক্স ধর টাকা নিয়েছে ২০২৩ সালে। অথচ রাজু ধর ত্যাজ্য ঘোষণা দেখাচ্ছে ২০১৯ সালের। সব সাজানো কাহিনি।” যীশু বণিকের দাবি, “রনেক্স চলে যাওয়ার পর ঘোষণার নাটক করে টাকা পরিশোধ এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করলে আসল সত্য বেরিয়ে আসবে।”

রতন বনিক’র অভিযোগ: অপু জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী রতন বনিক বলেন, “ওমেক্সদের কাছ থেকে আমরা ৬ কোটি টাকার স্বর্ণ পাওনা। আমি হামলা করিনি, শুধু সাইনবোর্ড পাল্টাতে গিয়েছিলাম।” তিনি দাবি করেন, “শুধু আমাদের কাছ থেকে নয়, আমার এক ভাতিজা পাবে ২ কোটি ৮০ লাখ, আরেকজন ২ কোটি, আরও একজন ২ কোটি ৪০ লাখ— মোট কোটি কোটি টাকার বকেয়া আছে। আমরা থানা ও আদালতে মামলা করেছি।”

পারিবারিক বিরোধই সূত্র: ওমেক্স ধর বলেন, তাঁদের পারিবারিক ব্যবসা ‘আর এস জুয়েলার্স’-এর সঙ্গে তাঁর বড় ভাই রনেক্স ধর যুক্ত ছিলেন। স্বর্ণ আত্মসাৎ ও প্রতারণার ঘটনায় ২০১৯ সালে তাঁদের বাবা রাজু ধর নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে রনেক্সকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেন। এরপর রনেক্স যীশু বণিকের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কে জড়ান। ওমেক্সের অভিযোগ, “যীশু বণিক পরিবারে বিভাজন তৈরি করে রনেক্সের দায়ভার এখন আমার ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।”

পুলিশ প্রশাসনের অবস্থান: ওমেক্স ধর দাবি করেন, কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ জানানো হলেও পুলিশ এখনো মামলা নেয়নি। তবে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তাকে মুঠোফোনে কল করেও কোন সাড়া না পাওয়ায়, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেওয়া যায়নি। যীশু বণিক জানান, “প্রশাসন উভয় পক্ষকে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ডেকেছে সেখানে রাজু ধর উপস্থিত না হওয়ায় কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি পুলিশ।

ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ: হাজারীগলির দীর্ঘদিনের স্বর্ণ ব্যবসার এলাকায় এখন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
প্রতিদিনের অভিযোগ–বিবাদে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে আছেন। ওমেক্স ধর বলেন, “আমরা ব্যবসায়ী মানুষ। এখন দোকানও খুলতে ভয় পাই। প্রশাসন হস্তক্ষেপ না করলে মুক্তির কোনো পথ দেখছি না।”