ছোট উদ্যোগ, বড় পরিবর্তন:
চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজারে ২০২৩ সালের শেষের দিকে মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ‘লিগ্যাল হোম’। দুই বছরের মাথায় সেই প্রতিষ্ঠান এখন দেশের আইন শিক্ষার্থীদের কাছে সাফল্যের প্রতীক।বার কাউন্সিল পরীক্ষার প্রস্তুতির পুরোনো ধারা থেকে বেরিয়ে এসে গবেষণানির্ভর গাইডেন্স, নিয়মিত টেস্ট ও পার্সোনাল মেন্টরিংয়ের মাধ্যমে লিগ্যাল হোম দেখিয়েছে নতুন পথ।
সাফল্যের সংখ্যা বলছে গল্প:
প্রথম বছরেই এই প্রতিষ্ঠানের ১৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জন পাস করে অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। আর দ্বিতীয় বছরেই ঘটে নজিরবিহীন সাফল্য—অফলাইন ও অনলাইন মিলিয়ে ৭৯৩ জন শিক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাম্প্রতিক ফলাফলে সারাদেশে মোট ৭,৯১৭ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন।
অর্থাৎ প্রায় ১০ শতাংশ সফল প্রার্থীই লিগ্যাল হোমের শিক্ষার্থী।
“এই সাফল্য কাকতালীয় নয়”:
লিগ্যাল হোমের সিইও ও সহকারী জজ (সুপারিশপ্রাপ্ত) সাইমন সৈয়দ বলেন, “আমরা কখনও সংখ্যার পেছনে ছুটিনি। লক্ষ্য ছিল শেখা, বিশ্লেষণ ও নৈতিকতার চর্চা। সাফল্য এসেছে স্বাভাবিকভাবেই।” তিনি জানান, শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত মডেল টেস্ট, রিভিশন ক্লাসও পার্সোনাল মেন্টরিং সেশন চালু করে। বর্তমানে লিগ্যাল হোমের শিক্ষার্থী সংখ্যা ১,৭০০-এর বেশি, যাদের একটি বড় অংশ অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত।
পাঠ্যবই নয়, গবেষণাভিত্তিক রিসোর্স
লিগ্যাল হোমের নিজস্ব প্রকাশনাগুলো এখন সারাদেশে জনপ্রিয়।
তাদের বইয়ের তালিকায় রয়েছে—প্রিলি বুলেট হ্যান্ডবুক, বিজেএস স্পেশাল বুলেটিন, প্রিলি ও লিখিত বুস্টার সিরিজ ও লিখিত হ্যান্ডবুক। এসব বইকে শিক্ষার্থীরা বলছেন, “সাফল্যের সহচর”।
মেন্টর প্যানেলে বিচারক ও শিক্ষকরা
লিগ্যাল হোমের মূল শক্তি এর মেন্টর টিম, যেখানে আছেন বিভিন্ন পর্যায়ের বিচারক ও অভিজ্ঞ আইনজীবীরা—সাইমন সৈয়দ, সহকারী জজ (সুপারিশপ্রাপ্ত) ও সিইও, ফারহান সামিন, বিচারক (চট্টগ্রাম) সাজ্জাদুর রহমান, বিচারক (ফরিদপুর), কামরুন্নেছা আরিফা, সহকারী জজ (সুপারিশপ্রাপ্ত)। তাঁদের দিকনির্দেশনায় শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতিই নিচ্ছে না, বরং পেশাগত নৈতিকতা ও বাস্তব আইনি অনুশীলন সম্পর্কেও ধারণা পাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা:
চট্টগ্রামের শিক্ষার্থী জানে আলম বলেন,“লিগ্যাল হোমে ভর্তি হওয়ার পর বুঝেছি, আইনজীবী হওয়া শুধু পেশা নয়, এটি এক মিশন।” নিলু আক্তার, যিনি চারবার লিখিত পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছিলেন, বলেন—“এবার লিগ্যাল হোমের মডেল টেস্ট আমাকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছে। ফলাফলের দিন আমি আনন্দে কেঁদেছিলাম।” রুবেল, তিনবার ব্যর্থ হওয়ার পর এবার সফল, জানালেন—“লিগ্যাল হোমে না আসলে এবারও পারতাম না। এটা আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।” তথ্য অনুযায়ী, এবারের লিখিত পরীক্ষায় ৫০–৬০ জন শিক্ষার্থী, যারা একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছিলেন, এবার সফল হয়েছেন লিগ্যাল হোমের সহায়তায়।
‘আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট’:
নিজের প্রতি সাম্প্রতিক অপপ্রচারের বিষয়ে জানতে চাইলে সাইমন সৈয়দ বলেন, “আমি কারও ক্ষতি করিনি, কারও রিজিকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিনি। আমি শুধু পরিবর্তনের একটি ছোট প্রচেষ্টা করেছি। আমার জন্য মহান আল্লাহই যথেষ্ট।” তিনি আরও জানান,“শিগগিরই আমি সিইও পদ থেকে সরে যাচ্ছি, তবে আজীবন সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে লিগ্যাল হোমের সঙ্গে থাকব।”
শিক্ষকের চোখে ‘লিগ্যাল হোম’:
চট্টগ্রাম আইন কলেজের অধ্যাপক ও সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ তৈয়ব ইব্রাহিম বলেন,“মাত্র দুই বছরে লিগ্যাল হোম দেশের আইন শিক্ষায় নতুন দিগন্ত খুলেছে। অধ্যবসায় ও নৈতিকতার মেলবন্ধনেই এসেছে এই সাফল্য।” তিনি আরও বলেন,“তরুণ প্রজন্মের জন্য এটি এক শিক্ষণীয় মডেল—
স্বপ্ন যদি সত্যি হয়, সময়ই ইতিহাস রচনা করে।”
দুই বছরে যে মাইলফলক:
| বছর | সাফল্য | শিক্ষার্থী সংখ্যা |
| ২০২৩ | ১৮ জনে ১১ জন অ্যাডভোকেট | প্রাথমিক ব্যাচ |
| ২০২৫ | ৭৯৩ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ | মোট ১,৭০০+ শিক্ষার্থী |
| প্রকাশনা | ৬টি জনপ্রিয় বই | প্রিলি ও লিখিত সিরিজ |
ভবিষ্যতের দৃষ্টি:
লিগ্যাল হোম এখন শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি কেন্দ্র নয়; তাদের লক্ষ্য— বাংলাদেশের আইনি শিক্ষায় একটি রিসার্চ ও নৈতিকতা ভিত্তিক শিক্ষা আন্দোলন গড়ে তোলা।

