চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধে এবার নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। মামলার নথিতে প্রকৃত মালিক মো. আলাউদ্দিনকে ‘সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও নোটিশ গোপন রাখা, তারিখ পরিবর্তন, এমনকি এসি ল্যান্ড ছাড়াই গোপনে জমি পরিমাপের অভিযোগ উঠেছে। সিসিটিভি ফুটেজে সেই দৃশ্য ধরা পড়লেও প্রতিবেদন আদালতে জমা না দেওয়ায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আদালতের নির্দেশ ও নোটিশের জন্ম:
মামলাটি ছিল চট্টগ্রাম অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (মহানগর) আদালতের নং–১০২৭/২০২৩। আদালতের নির্দেশে বলা হয়েছিল—সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরাসরি তদন্ত করে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর বিকেলে চিকনদন্ডী ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে জারি হওয়া এক নোটিশে আলাউদ্দিনকে ‘সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক’ আখ্যা দিয়ে তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে মনগড়া প্রতিবেদনও আদালতে পাঠানো হয়। পরে ভুক্তভোগী আলাউদ্দিন বিষয়টি জানতে পেরে আপত্তি জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২৯ মে আবার একটি নোটিশ জারি হয়। কিন্তু সে দিন তাঁকে না জানিয়ে বাদী পক্ষের সার্ভেয়ারকে নিয়ে এসি ল্যান্ড ছাড়া গোপনে জমি পরিমাপ করা হয়। ওই ঘটনার ভিডিও সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। এরপর ৬ জুন এসি ল্যান্ড সরেজমিনে গিয়ে পরিমাপ করলেও তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়েনি। আদালত যেখানে ১০ দিনের মধ্যে রিপোর্ট চেয়েছিলেন, সেখানে এ বিলম্ব নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। এসি ল্যান্ড অফিসের ভেতরের একটি সূত্র জানায়, প্রাথমিক খসড়া প্রতিবেদনে বাদী আরাফাত হোসেন হীরার পক্ষে দখল দেখানোর চেষ্টা হয়েছে, যদিও বাস্তবে তাঁর দখল নেই।
আলাউদ্দিনের অভিযোগ:
ভূমির প্রকৃত মালিক আলাউদ্দিন বলেন, তাঁকে না জানিয়ে প্রথমে নোটিশ গোপন রাখা হয়। পরে প্রতিপক্ষকে সুবিধা দিতে তারিখ পাল্টে গোপনে পরিমাপ করা হয়। “প্রথমে আমাকে বলা হলো আমি নোটিশ পেয়েছি। আমি প্রতিবাদ করলে হাতে লেখা নতুন তারিখ ধরিয়ে দেওয়া হয়। ওই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন ওবায়দুল আকবর ও বিমান বড়ুয়া,” অভিযোগ করেন তিনি।
আলাউদ্দিন আরও জানান, তিনি বারবার এসি ল্যান্ড অফিসে নথি দেখতে চাইলে কেউ কিছু বলতে চাননি। পরে বহু ঘোরাঘুরির পর চিকনদন্ডী ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে নোটিশটি উদ্ধার করেন। তাঁর ভাষায়, “নোটিশের ভিত্তিতে আদালতে আমার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, এমনকি মিথ্যা ফৌজদারি অভিযোগ পর্যন্ত তোলা হয়েছে। আমাকে সন্ত্রাসী বানিয়ে প্রতিপক্ষকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।”
প্রশাসনের সাফাই:
ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ওবায়দুল আকবর অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, “ওই সময় বিমান বড়ুয়ার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ভুলবশত ‘সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক’ লেখা হয়। এটা কেবল টাইপিং মিসটেক। পরে সংশোধনও করা হয়েছে।”
তবে সাক্ষর করার সময় এমন গুরুতর ভুল চোখে না পড়া এবং সংশোধনী আদালত বা বাদীপক্ষকে যথাসময়ে না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি কোনো সুস্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি। ফলে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
আদালতের নির্দেশ অমান্য?:
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে ইউনিয়ন ভূমি অফিস দিয়ে পরিমাপের চেষ্টা করা কিংবা নোটিশে পক্ষপাতমূলক শব্দ ব্যবহার করা গুরুতর প্রশাসনিক অনিয়ম। আদালত যেখানে সরাসরি এসি ল্যান্ডকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন, সেখানে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সম্পৃক্ততা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন তোলে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন:
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে ইউনিয়ন ভূমি অফিস কেন গোপনে নোটিশ জারি করল? প্রকৃত মালিককে ‘সন্ত্রাসী’ বানানোর পেছনে কার স্বার্থ কাজ করেছে? এসি ল্যান্ড তদন্ত শেষ করেও কেন তিন মাস ধরে প্রতিবেদন আদালতে জমা দিচ্ছেন না?
প্রতিকার কোথায়?:
আলাউদ্দিন বলেন, “আমি বহুবার এসি ল্যান্ড অফিসে গিয়েছি। কিন্তু এখনো কোনো প্রতিবেদন পাইনি। আমি প্রশাসনের কাছে এর ন্যায়সংগত প্রতিকার চাই।” স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এটি কেবল একটি জমি বিরোধ নয়—এটি প্রশাসনিক জবাবদিহি ও ন্যায্যতার প্রশ্ন। নোটিশের ভাষা, প্রক্রিয়ার গোপনীয়তা আর আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা—সব মিলিয়ে এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া জনগণের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।
উল্লেখ্য, এর আগে তৎকালীন এসি ল্যান্ড আবু রায়হান, ইউএনও এবং ভারপ্রাপ্ত এসি ল্যান্ড মশিউর রহমান সরেজমিনে গিয়ে পরিমাপ করে আলাউদ্দিনের পক্ষে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। বাদী পক্ষ সেই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দিলে আবারও ইউএনও ও ভারপ্রাপ্ত এসি ল্যান্ড পুনঃতদন্ত করে একই রকম প্রতিবেদন দেন। তবু বাদী পক্ষ আবারও নারাজি জানালে আদালত সরাসরি এসি ল্যান্ডকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন। অথচ সেই নির্দেশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

